Home সারাদেশ বার্তা জনিকের জীর্ণ কুটিরে বসেছিলেন বঙ্গবন্ধু!

জনিকের জীর্ণ কুটিরে বসেছিলেন বঙ্গবন্ধু!

163
0

অনিতাকে প্রাণ ভরে ভালোবাসতাম। একপর্যায়ে হাড় কাঁপানো পৌষের এক রাতে গারো সমাজের রীতি অনুযায়ী দুই জনকে এক ঘরের পৃথক দুই দরজায় ভেতরে প্রবেশ করিয়ে বাইরে খিড়কি দেওয়া হয়। নিশিবসান ঘটে মোরগ ডাকা ভোরে। দুই হাত মিলিয়ে একই দরজায় হাসিমুখে বেরুলাম দুই জন। বিহান বেলায় দুই জনের এক দরজায় হাসিখুশিতে বেরোতে দেখে বাড়ির সবাই উত্ফুল্ল হয়। তারপর পুরোহিত ডাকা হলো। গারো রীতিতে মন্ত্রজপ আর মালা বদল হলো। দুটো বন মোরগ এনে গলা টেনে ছিঁড়ে ফেলা হলো। শুরু হলো নতুন জীবন। সেই যে বিনে সুতোর মালায় অনিতা অঙ্কশায়িনী হলেন তা টিকেছিল টানা পঁয়ষট্টি বছর। এভাবেই নিজের জীবনের গল্প করছিলেন ত্রিকালদর্শী গারো জনিক নকরেক।

জনিকের বর্তমান ঠিকানা টাঙ্গাইলে মধুপুর উপজেলার চুনিয়া গ্রামে। তার জন্ম ১৯১৪ সালে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উদ্য়পুর। বাবা অতীন্দ্র মৃ। মা অনছি নকরেক। মধুপুর বনাঞ্চলের পীরগাছা ছিল নানার বাড়ি। নানা সুরমান চিরান। নানি বালমি নকরেক। সেই সূত্রেই ত্রিপুরা থেকে মধুপুরে আসা। বিয়ের পর ত্রিপুরায় ফেরা হয়নি জনিকের। ঘরে ছয় ছেলে, তিন মেয়ে । চার ছেলে ঘর জামাই গেছে। মেয়ে বৈজয়ন্তী নকনার মর্যাদায় বাড়িতে জামাই এনেছেন। নাতি-নাতনির সংখ্যা জনা তিরিশেক। জমিজমা খুব একটা নেই। কায়ক্লেশে দিন চলে।

ইতিহাসের জীবন্ত কিংবদন্তি জনিক। বাল্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের গল্প শুনেছেন। যৌবনে ব্রিটিশ শাসনের দাপট দেখেছেন। ভারত বিভক্তি প্রত্যক্ষ করেছেন। ‘হাতমে বিড়ি মুখমে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ স্ল্লোগান শুনেছেন। মধুপুর থেকে ময়মনসিংহ চল্লিশ কিলো কাঁচা রাস্তা পায়ে হেঁটে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও মহাত্মা গান্ধীর জনসভায় গিয়েছেন। কিন্তু ব্রিটিশ শাসন অবসানে পাকিস্তানের জন্ম হলেও আদিবাসী গারোদের লাভ হয়নি। দুই বারের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় গারোরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেকেই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যায়। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে গারোরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। এখনো গারোরা ভূমির মালিকানা নিয়ে বনবিভাগের সঙ্গে লড়াই করছে।

জনিক জানান, জীবনের সবচয়ে বড়ো স্মৃতি ৭১ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মধুপুর বনাঞ্চলের দোখলা বাংলোতে অবস্থানকালে বিরল সাক্ষাত্। বেগম মুজিব ও শেখ রাসেল ছিলেন সফরসঙ্গী। দোখলা বাংলোতে অবস্থানকালে চুনিয়া গ্রাম পরিদর্শনের সময় জনিকের জীর্ণ কুটিরেও একদণ্ড বসেছিলেন বঙ্গবন্ধু। স্মৃতি হাতড়ে এই শতবর্ষী জানান, সে সময় মধুপুর জঙ্গলে জুম চাষ হতো। শুধু লবণ, কেরোসিন আর বস্ত্র কেনা ছাড়া গারোরা জঙ্গলের বাইরে হাট-বাজারে আসত না। তিনি নিজ হাতে অনেক বাঘ, হরিণ ও মহিষ শিকার করেছেন বলে জানান।

বেসরকারি সংস্থা শেড প্রকাশিত গ্রন্থ ‘madhupur, the vanishing forest and her people agony’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, মধুপুর বনাঞ্চলে আদিবাসী গারো জনসংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার। এদের প্রায় সবাই খ্রিষ্টান। সাংসারেক বা আদি গারো ধর্মাবলম্বী মাত্র ৪৭ জন। নানা কারণে গারোরা তাদের আদি ধর্ম ছেড়ে খ্রিষ্টান হলেও জনিক নকরকের মতো হাতেগোনা কিছু গারো এখনো আদিধর্ম আঁকড়ে রয়েছেন।

জনিক এখনো আদি গারোদের মতো পূজা-পার্বণ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন। পরিবারের সবাই খ্রিষ্টান হলেও নিজের মতাদর্শ থেকে তিনি এক চুলও নড়েননি। তার আফসোস ধর্মীয় প্রার্থনার জন্য কোনো মন্দির নেই। থাকার ঘরের একাংশকে তিনি মন্দির হিসেবে ব্যবহার করেন। তার অন্তিম ইচ্ছা কেউ না কেউ, কোনো না কোনো দিন, তার ডাকে সাড়া দিবেন। গারোদের জন্য একটা মন্দির নির্মাণ করে দেবেন। মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডার জন্য যদি সরকার প্রতি বছর অনুদান দিতে পারেন, তাহলে স্বীকৃত গারো ধর্মের মন্দিরের জন্য কেন অনুদান দেওয়া হবে না!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here