Home » parbatta-barta » পাহাড়ে জ্ঞানশ্রী মহাথের শিক্ষা বাতিঘর: করুণা শিশু সদন

পাহাড়ে জ্ঞানশ্রী মহাথের শিক্ষা বাতিঘর: করুণা শিশু সদন

“বহুজন হিতায়’ বহুজন সুখায়” স্লোগানটি নিয়ে পথযাত্রা শুরু হয় করুণা শিশু সদন। বান্দরবানে পার্বত্য জেলা থানচি উপজেলায় বলিপাড়াতে আইলমারা পাড়া অবস্থিত এ শিক্ষা বাতিঘরটি ২০০০ সাল থেকে শুরু করলেও প্রতিষ্ঠানিভাবে শুরু হয়েছে ২০০৬ সাল থেকে। হাটিঁ হাটিঁ পা পা করে আজ ১৯টি বছর অতিক্রমে পথে। বিগত দেড় দশকে মধ্যে এ শিশু সদনটি সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে থানচি উপজেলা ছাড়িয়ে পাহাড়ের বাইরে, এমনকি শহড়েও। এটিই এখন থানচিতে সবচেয়ে বড় শিশু সদন ।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি ভাষাগত সংখ্যালঘু পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর শিশু শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার পাশাপাশি যেন নিজস্ব সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকেও ধারণ করে বেড়ে উঠতে পারে, সে জন্য এই হোস্টেলে শিক্ষকরা সদা তৎপর।পড়া-লেখা পাশাপাশি খেলাধুলা, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ঐতিহ্যবাহী নাচ-গানসহ ইত্যাদি প্রশিক্ষণেও পিছিয়ে নেই এই শিশু সদনে।

আবার করুণা শিশু সদনে’ প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীরাও ছুটিতে শিক্ষাঙ্গনটিতে ছুটে আসেন প্রাণের টানে। বিনা বেতনে তাঁরা খুদে শিক্ষার্থীদের লেখাপাড়ার পাশাপাশি মমতা আর ভালোবাসায় স্বপ্ন দেখান এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা এসে মাসব্যাপী ও ফ্রি কোচিং করা হয়।
প্রতি বছর এই প্রতিষ্ঠান থেকে জেএসসি পরীক্ষায় পাস করছে শতক ভাগের শিক্ষার্থী। আর বরাবরই মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণের সংখ্যা থাকছে প্রায় ৯০শতাংশ। পিএসসি ও জেএসসিতে ট্যালেন্টপুরে বৃক্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও কম নয়।

করুণা শিশু সদনে ইতিকথাঃ শিশু সদনটি প্রথমে ১৯৯২ সাল দিকে ধম্মাজায়া বৌদ্ধ বিহার নামে এক বৌদ্ধ মন্দির ছিলো, তখনও বেশ কিছু দুর্গম এলাকা থেকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ে ছেলেরা থাকতো ৪০-৪৫ জনের মত। এরপরে থেকে প্রতিষ্ঠা গুরু ভান্তে শ্রীমৎ জ্ঞানশ্রী মহাথেরো আরো একটু স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন তিনি। তখন বাচ্চাদের খাবারে জোগান দিতে অনেক সময় হিমশিস ও খেটে হয় গুরু ভান্তে কে।তবে দায়ক-দায়িকাদের সহযোগীতায় এবং নিজেদের পারিশ্রমিক বিভিন্ন কাজের হাল ছাড়েনি। একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন দেশে যুদ্ধবিধ্বস্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে অসংখ্য পাহাড়ি শিশু অনাথ, অসহায় ও ছিন্নমূল হয়ে পড়ে। থানচির মত জায়গাতে যেখানে নেই কোন ভালো স্কুল কলেজ, সেখানে পিছিঁয়ে পরা গরীব ও অসহায় বাচ্চাদের কে নিয়ে শিক্ষা আলো ছড়িয়ে দেন তিনি।

জ্ঞানশ্রী মহাথেরো প্রেরণায় তাঁরই অনুসারী অনেক ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যন্ত অধ্যয়নরত আছে বর্তমানে। এছাড়াও সরকারী -বেসরকারী বিভিন্ন পেশায় শিষ্যরা ও আছে বহু এর শিশু সদন থেকে। আর এদিকে বর্তমানে থানচি শিক্ষিত সমাজের সবার কাছে করুণা শিশু সদনে অবদান কথাও ভূলেনি কেউ।
বর্তমানে বান্দরবানের ২টি উপজেলার থেকেই নানা ভাষাভাষী পাহাড়ি শিশুরা এসে ভর্তি হচ্ছে শিশু সদনটিতে । এখন সেখানে শিশু -দশম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীসহ ছাত্রছাত্রীর মোট সংখ্যা প্রায় ১৫০ জন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই আবার কন্যাশিশু । এ পর্যন্ত প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী সাফল্যের সঙ্গে পাস করেছে করুণা শিশু সদন থেকে। প্রতিষ্ঠানের অধীনে এখন একটি দোতলা আবাসিক ছাত্রাবাস এবং ১টি টীম সেটে ছাত্রীনিবাস ও রয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীর না থাকলেও সব দেখাশুনা পরিচালক গুরু ভান্তে নিজেই দ্বায়িত্বে সাহিতে চালিয়ে যেত।

করুণা সদনে প্রাণঃ করুণা শিশু সদনে উদ্দেশ্য কী? এমন প্রশ্নের জবাবে পরিচালক জ্ঞানশ্রী মহাথেরো বলেন, “দেশ গড়ার কারিগর তৈরি করাই আমাদের উদ্দেশ্য। দুস্থ শিশুদের শুধু শিক্ষিত করা নয়, তারা যেন পাহাড়, প্রকৃতি, নিজস্ব মাতৃভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে ভালোবাসে, তারা যেন দেশপ্রেমিক সুনাগরিক হয়। “আধুনিক সংস্কৃতির চোরা স্রোতে হারাতে বসা পাহাড়িদের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে এবং দুর্গম পিছিঁয়ে পরা শিশুদের কে শিক্ষা চক্ষু দান করা,সেটিই আমাদের লক্ষ্য।

লিখেছেন : চহ্লামং মারমা (চহ্লা) করুণা শিশু সদনে সাবেক ছাত্র(২০0৫)।

আপনি এই খবরটি শেয়ার করতে পারেন!
প্রকাশ: শুক্রবার, আগস্ট ২৮, ২০২০এই লেখাটি 148 বার পড়া হয়েছে